নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি।
নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বড়ইতলা এলাকায় নির্মাণাধীন নতুন জেলা কারাগারের নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা বেশি বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় নির্মাণকাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন-এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন প্রকল্পটির বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে। অথচ প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা ও পরিদর্শন অনুযায়ী প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে কাজের পরিমাণ ও পরিশোধিত বিলের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ব্যবধান দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।” তিনি আরও জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগ দেখছে।
গণপূর্ত বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদীর পুরোনো জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন কারাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে শিবপুর উপজেলার বড়ইতলা এলাকায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর নতুন জেলা কারাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয় প্রায় তিন বছর আগে।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। প্রকল্পটির মোট চুক্তিমূল্য প্রায় ৬৭ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজ চলাকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি অনুযায়ী প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃত কাজের পরিমাণের চেয়ে বেশি অর্থের বিল কীভাবে পরিশোধ করা হলো এবং বিল পরিশোধের আগে কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। একপর্যায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও বর্তমানে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাজের অগ্রগতি, বিল উত্তোলন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
অনিয়মের অভিযোগের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দুই বছরের জন্য বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এ সুপারিশের চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ছাড়া প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ হয়ে থাকলে তার কত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগের পাশাপাশি নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তিনি প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন।
তবে এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুছা। তাঁর ভাষ্য, “এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
তিনি আরও বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগ দেখছে।
নতুন কারাগার নির্মাণে ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুরোনো নরসিংদী জেলা কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, পুরোনো কারাগারটির ধারণক্ষমতা প্রায় ৩০০ জন। এর বিপরীতে বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বন্দি রয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ বন্দি থাকায় আবাসন, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া পুরোনো কারাগার এলাকার একটি বড় অংশ সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে তলিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে বন্দিদের পাশাপাশি কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কারাগারটি দ্রুত নির্মাণ করে চালু করা গেলে অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমানোর পাশাপাশি কারাগারের পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
নির্মাণকাজে ধীরগতি, কাজ বন্ধ রাখা এবং বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় বেশি বিল উত্তোলনের অভিযোগের কারণে প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হওয়ার বিপরীতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিল উত্তোলনের যে অভিযোগ উঠেছে, তার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রকল্পের মাপ বই (Measurement Book), রানিং বিল, বিল পরিশোধের ভাউচার, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র এবং প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কোন কর্মকর্তা কাজের পরিমাণ যাচাই করেছেন, কার সুপারিশে বিল প্রস্তুত হয়েছে এবং কোন পর্যায়ের অনুমোদনের পর অর্থ ছাড় করা হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
নরসিংদীর নতুন জেলা কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা না থাকলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত অবস্থাও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
এ জন্য প্রকল্পটির স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক অডিট, কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই এবং বিল পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ও বিল পরিশোধের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা থাকলে সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকানো এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পথও উন্মুক্ত হবে।