দেওটি ভূমি অফিসে ঘুষ-দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ
নোয়াখালী বাবার অফিসে সরকারি নিয়োগ ছাড়াই ছেলের কাজ করার অভিযোগ, ভিডিওতে ঘুষের টাকা নিয়ে দেনদরবার
নোয়াখালী প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি সেবা দিতে গিয়ে অনিয়ম, ঘুষ আদায়, দালালনির্ভরতা এবং নিয়োগবহির্ভূত ব্যক্তিকে দিয়ে সরকারি কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছে। একই পরিবারের বাবা-ছেলেকে ঘিরে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দেওটি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জয়নাল আবেদিনের অফিসে তার ছেলে নাইম হোসেন কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, কয়েকজন দালালের মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট ভূমি অফিসের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। দালালদের মাধ্যমে না গেলে অনেক সময় ফাইল এগোয় না। ফলে হয়রানি এড়াতে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।
সম্প্রতি নিজের জমির নামজারি করতে দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান এক নারী। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকদিন ঘোরাঘুরির পরও কাজ না হওয়ায় তাকে ঘুষের টাকা নিয়ে অফিসে আসতে হয়। চড়া সুদে ৮ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আনলেও দাবি করা ৯ হাজার টাকা দিতে না পারায় শুরু হয় দেনদরবার।
এ ঘটনায় ঘুষের টাকা নিয়ে ওই নারীর সঙ্গে তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের কথোপকথনের একটি ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভিডিওতে ওই নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘সুদে টেঁয়া লই কাম ইয়ান করি আটকি গেছি। … অন আঁত্তুন ওগগা হাজার টেঁয়া কম নেন। আননে নয় হাজার টেঁয়া চাইছেন, আঁই আন্নেরে আস্টে হাজার টেঁয়া দিছি।’
ভিডিওতে ঘুষের টাকা নিয়ে দেনদরবারের বিষয়টি উঠে এলেও এর প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট অর্থের প্রকৃত গন্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, জয়নাল আবেদিনকে ঘিরে ৫ থেকে ৭ জনের একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে মতিউল ইসলাম শামিম, সাহাদাত হোসেন ও অফিস সহকারী মোস্তফার নাম সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্যে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।
‘টাকা ছাড়া কাজ নিয়ে গেলে বলে—বিনা পয়সার কাম কিল্লাই আনছেন?’
ঘুষের টাকা নিয়ে দেনদরবারের ভিডিওটির বিষয়ে তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ভিডিওটির সত্যতা স্বীকার করেন। তবে নিজের জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলি আমাকে কাজ দিয়েন না, আমি বয়স্ক মানুষ। মাফ চাই, আমি নিজের জন্য টাকা নেই না। কাজ না হলে ওই মহিলার টাকা ফিরিয়ে দিবো।’
অর্থ ভাগাভাগির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই টাকা উপজেলা ভূমি অফিসকে ভাগ করে দিতে হয়। সবাই ভাগ পায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘টাকা ছাড়া কাজ নিয়ে গেলে বলে—বিনা পয়সার কাম কিল্লাই আনছেন? মক্কেল পাঠায় দেন।’
কারা এই টাকা নেয়—এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নাল আবেদিন দাবি করেন, দেওটি তহসিল অফিস ‘মেইনটেইন’ করেন উপজেলা ভূমি অফিসের আনোয়ার। নাজমুল, ফরহাদসহ অন্যরাও আলাদা আলাদা তহসিল অফিস ‘মেইনটেইন’ করেন বলেও তিনি দাবি করেন।
নির্ধারিত টাকা দিতে না পারলে সেবাগ্রহীতাকে উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয় বলেও জানান তিনি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) কত টাকা পান—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার হাত-পা বাঁধা, তবে এটুকু বলি সবাই ভাগ পায়।’
তবে তার এসব বক্তব্যের স্বপক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিয়োগ ছাড়াই অফিসে ছেলে
এদিকে তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের ছেলে নাইম হোসেন কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই বাবার অফিসে বসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়নাল আবেদিন তার ছেলে অফিসে কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে কী ধরনের অনুমোদন বা সরকারি ব্যবস্থার আওতায় তার ছেলে সেখানে কাজ করছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নাইম হোসেনও সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নির্ধারিত ফি কত
ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ, নামজারি ও মিউটেশন আবেদনের যাচাই-বাছাই ও তদন্ত, খতিয়ান সংরক্ষণ ও হালনাগাদ, খাসজমি বন্দোবস্তের প্রস্তাব তৈরি এবং জমির সীমানা ও মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধের প্রাথমিক তদন্তসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়া হয়।
সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ই-নামজারির জন্য ১ হাজার ১৭০ টাকা, খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফাইড কপির জন্য ১২০ টাকা, মৌজা ম্যাপের প্রতি শিটের জন্য ৫৪৫ টাকা এবং খতিয়ান সংশোধনের আবেদনের জন্য ২০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।
কিন্তু সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত ফি দিয়ে সরাসরি সেবা নিতে গেলে তাদের দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হয়। একপর্যায়ে হয়রানি থেকে বাঁচতে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ করাতে বাধ্য হন তারা।
তদন্তের দাবি
অভিযোগের বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি ভূমি অফিসে যদি ঘুষ লেনদেন, দালালনির্ভরতা এবং নিয়োগবহির্ভূত ব্যক্তির মাধ্যমে সরকারি সেবা দেওয়ার অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সেবা কার্যক্রমে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা।