নির্বাচনী মাঠে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে অবৈধ অস্ত্র
তপশিলের আগেই বাড়ছে সন্ত্রাসী তৎপরতা, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
নাজাত ডেস্ক রিপোর্ট।
প্রকাশ: ৭ নভেম্বর ২০২৫
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠ এখন সরগরম। বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এ নির্বাচনী উত্তাপের মাঝেই ভয় ছড়াচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অপব্যবহার।
গত বুধবার চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ নির্বাচনী জনসংযোগে বের হলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন তিনি। এ ঘটনায় আরও তিনজন গুলিবিদ্ধ হন, যার মধ্যে একজন মারা যান। ওই রাতেই চট্টগ্রামের রাউজানে দুই পক্ষের সংঘর্ষে পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়।
নিরাপত্তা হুমকিতে নির্বাচন
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্ট পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি—যা বড় উদ্বেগের কারণ।
অস্ত্র উদ্ধারে জোর দিচ্ছে পুলিশ
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে লুণ্ঠিত ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং আইজিপি বাহারুল আলম মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ৫,৭৬৩টি লুণ্ঠিত অস্ত্রের মধ্যে ৪,৪২১টি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো ১,২০৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি গুলি উদ্ধার বাকি রয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধারে সহায়তাকারীদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে—
লুণ্ঠিত এলএমজির তথ্য দিলে ৫ লাখ টাকা
এসএমজি: ১.৫ লাখ
চায়না রাইফেল: ১ লাখ
পিস্তল/শটগান: ৫০ হাজার
প্রতি রাউন্ড গুলি: ৫০০ টাকা
সীমান্তে নজরদারি জোরদার
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে সীমান্ত থেকে অন্তত ১৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১,০০০ গুলি, গ্রেনেড ও বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। বিজিবি বলছে, নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচারের চেষ্টা বাড়ছে, তাই গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিমানবন্দরে অস্ত্র উদ্ধার
গত ২৬ অক্টোবর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের বগি থেকে সেনাবাহিনী ৮টি বিদেশি পিস্তল, ২৬ রাউন্ড গুলি, গান পাউডার ও বিস্ফোরক উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অস্ত্র সীমান্ত হয়ে ঢাকায় আসছিল নির্বাচনী সহিংসতার জন্য।
বিশেষজ্ঞদের মত
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন,
> “নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হতে পারে। পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও পাচার হওয়া অস্ত্র দুটোই এখন বড় ঝুঁকি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন,
> “একজন প্রার্থীর ওপর গুলি চালানোর ঘটনা অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে। এ আতঙ্ক নির্বাচনকালীন শান্তিপূর্ণ পরিবেশের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, থানা থেকে লুণ্ঠিত প্রায় ৩০ শতাংশ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। সীমান্ত দিয়েও নতুন অস্ত্র দেশে ঢুকছে। এগুলো দ্রুত জব্দে বিশেষ অভিযান চালানো জরুরি।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সমন্বিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি না বাড়ালে নির্বাচনকালীন সহিংসতার আশঙ্কা থেকেই যাবে।