ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত রাজনৈতিক মাঠ
বিএনপি–জামায়াত–এনসিপির পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে বাড়ছে উত্তেজনা।
আর এ লায়ন সরকার।
দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকেই সারা দেশে রাজনৈতিক মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও পথসভায় উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে জড়িয়ে পড়ছেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। স্বাধীনতার ইতিহাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ, ভোট কেনার অভিযোগ, বিদেশি প্রভাব ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা—সব মিলিয়ে কথার লড়াই এখন ভোটের রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
এই রাজনৈতিক বাগযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক জনসভায় বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তুলেছেন।
সিলেটের এক জনসভায় তারেক রহমান বলেন, “জান্নাত ও জাহান্নামের মালিক আল্লাহ। অথচ কেউ কেউ এসবের কথা বলে ভোট চাইছে, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করার শামিল।” একই সঙ্গে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন।
তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক ও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, জামায়াত কখনোই মানুষের ভোট কেনার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, “কোনো ধরনের কার্ড, প্রলোভন কিংবা ভয় দেখিয়ে জনগণকে প্রভাবিত করার সংস্কৃতি জামায়াত গ্রহণ করে না।” নৈতিকতা, সৎ নেতৃত্ব ও জবাবদিহির রাজনীতির কথা বলার কারণেই দলটির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপি নেতৃত্বের বক্তব্যকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার-বহির্ভূত আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ সংক্রান্ত মন্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তার ভাষায়, ধর্মকে বিদ্রুপ করে রাজনীতি করা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে তিনি ১৯৭১ সালের ইতিহাস ও অতীত রাজনৈতিক সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির বক্তব্যের পাল্টা প্রশ্ন তোলেন।
এদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতারাও জামায়াতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। মাঠপর্যায়ে বিএনপির বিভিন্ন প্রার্থী ও নেতার বক্তব্যেও জামায়াতবিরোধী সমালোচনাই প্রাধান্য পাচ্ছে। কোথাও কোথাও বক্তব্যের ভাষা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ের এই রাজনৈতিক উত্তাপের প্রভাব পড়েছে জেলা ও সংসদীয় আসনগুলোতেও। নরসিংদী-১, রায়পুরা-৫, পলাশ-২, শিবপুর-৩, মনোহরদী ও বেলাব-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের বক্তব্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাল্টাপাল্টি অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসব এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভায় ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক কৌতূহলের পাশাপাশি উত্তেজনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি আদর্শিক ও ধর্মীয় বক্তব্য বড় ভূমিকা রাখছে। তবে অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক ভাষা ও পাল্টা অভিযোগ ভোটের পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে তারা সতর্ক করছেন।