তারাগঞ্জে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের মান নিয়ে অসন্তোষ, তদন্তের আশ্বাস খাদ্য বিভাগের

 

তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:

 

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা চালের গুণগত মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন উপকারভোগীরা। চাল রান্নার পর দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ ও স্বাদহীনতার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। পাশাপাশি কয়েকটি বিতরণকেন্দ্রে নিম্নমানের চাল এবং ছেঁড়া-ফাটা বস্তায় চাল সরবরাহের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

 

উপকারভোগীদের অভিযোগ, আগের তুলনায় এবার বিতরণ করা চালের মান খারাপ। স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে কম দামে চাল সরবরাহ করলেও মানসম্মত চাল না পাওয়ায় তাঁরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামের রুপিয়া বেগম বলেন, সরকার কম দামে চাল দেয়, যাতে দরিদ্র মানুষ খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু এবার দেওয়া চাল রান্নার পর বেশিক্ষণ ভালো থাকে না এবং খেতেও তেমন স্বাদ পাওয়া যায় না। পুষ্টিকর চালের পরিবর্তে নিম্নমানের চাল পাওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

 

একই ইউনিয়নের পবন রায় বলেন, আগে ভালো মানের চাল পেয়েছেন। এবার পাওয়া চালের মান নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। অন্যদিকে ইকরচালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আনছার আলীর অভিযোগ, সকালে রান্না করা ভাত বিকেল পর্যন্ত ভালো থাকে না। তাঁর ভাষ্য, পুষ্টিকর চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের চাল দেওয়া হচ্ছে।

 

আলমপুর ইউনিয়নের চকতাহিরা গ্রামের মজনু মিয়াও চালের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, এবারের চাল থেকে দুর্গন্ধ আসে এবং রান্নার কিছুক্ষণ পরই ভাত নষ্ট হয়ে যায়। এতে দরিদ্র পরিবারগুলোর ভোগান্তি বাড়ছে।

 

উপকারভোগীদের অন্তত ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলে চালের মান নিয়ে একই ধরনের অসন্তোষের কথা জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

১০ হাজারের বেশি উপকারভোগী

 

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ২১ জন ডিলারের মাধ্যমে ১০ হাজার ২২৬ জন উপকারভোগীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়। প্রতি কেজি চালের নির্ধারিত মূল্য ১৫ টাকা।

 

কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী চাল বিতরণের সময়সূচি, সঠিক ওজন, চালের গুণগত মান এবং বিতরণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর রয়েছে।

 

তবে সরেজমিনে উপজেলার অন্তত সাতটি ডিলারের বিতরণকেন্দ্রে চালের মান ও ছেঁড়া-ফাটা বস্তা ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বিতরণ কার্যক্রমের নিয়মিত তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

 

দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু সায়েম হাসান জানান, প্রায় এক বছর আগে খাদ্য অফিস থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলেন। এরপর নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার সুযোগ হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। মাঝেমধ্যে ডিলাররা চাল বিতরণের বিষয়ে তাঁকে জানান।

 

তারাগঞ্জ বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীন আপান অভিযোগ করেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নিম্নমানের চাল বিতরণের পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি থাকতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের অভিযোগ সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।

 

তিনি চাল সংগ্রহ ও সরবরাহের প্রক্রিয়া তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

 

দায় এড়াচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা, তদন্তের আশ্বাস জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের

 

চালের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার আব্দুস সামাদ বলেন, সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে যেভাবে চাল সরবরাহ করা হয়, তাঁরা সেভাবেই কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণ করেন। চালের গুণগত মান নির্ধারণে তাঁদের ভূমিকা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

 

উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, জেলা কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আফরোজা বেগমও লিখিত অনুমতি ছাড়া বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

 

তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ছালেহ আজিজ। তিনি বলেন, খাদ্য সংগ্রহের বাইরে থেকেও কিছু চাল আসতে পারে। নিম্নমানের চাল বিতরণ ও আর্থিক লেনদেনসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

স্থানীয় উপকারভোগীদের দাবি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের গুণগত মান পরীক্ষা, বিতরণকেন্দ্রে নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারি এই কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলো যেন মানসম্মত চাল পায়।

 

প্রতিবেদকের মন্তব্য: চালের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।